ইয়াজুজ-মাজুজ কারা? এদের সম্পর্কে বিস্তারিত ।

শেষ জামানার অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে এই ইয়াজুজ-মাজুজ। এরা এমন এক জাতি যারা আমাদের দুনিয়ার মধ্যেই আছে ! অথচ এই আধুনিক যুগেও এটা বের করা সম্ভব হয়নি তারা পৃথিবীর কোথায় আছে। মূলত আল্লাহ না চাইলে কারোই তা বের করা সম্ভব না। তারা একটি প্রাচীরের মধ্যে আটকা আছে, কিয়ামতের পূর্বে আল্লাহ তাআলা তাদের সেখান থেকে বের করবেন।

বিস্তারিত জানতে পড়ূনঃ
– ইয়াজূজ এবং মাজূজ হচ্ছে আদম সন্তানের মধ্যে দু’-টি গোত্র, যেমনটি হাদিস এবং বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তাদের মধ্যে কিছু মানুষ অস্বাভাবিক বেঁটে, আবার কিছু অস্বাভাবিক লম্বা। কিছু অনির্ভরযোগ্য কথা-ও প্রসিদ্ধ যে, তাদের মাঝে বৃহৎ কর্ণবিশিষ্ট মানুষও আছে, এক কান মাটিতে বিছিয়ে এবং অপর কান গায়ে জড়িয়ে বিশ্রাম করে।
বরং তারা হচ্ছে সাধারণ আদম সন্তান। বাদশা যুল কারনাইনের যুগে তারা অত্যাধিক বিশৃঙ্খল জাতি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। অনিষ্টতা থেকে মানুষকে বাঁচাতে যুল কারনাইন তাদের প্রবেশ পথে বৃহৎ প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন।

নবী করীম সা. বলে গেছেন যে, ঈসা নবী অবতরণের পর তারা সেই প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। আল্লাহর আদেশে ঈসা আ. মুমিনদেরকে নিয়ে তূর পর্বতে আশ্রয় নেবেন।
অতঃপর স্কন্ধের দিক থেকে এক প্রকার পোকা সৃষ্টি করে আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করবেন।

ঐতিহাসিক সেই প্রাচীর নির্মাণঃ
যুল কারনাইনের আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেন- “আবার সে পথ চলতে লাগল। অবশেষে যখন সে দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যস্থলে পৌঁছল, তখন সেখানে এক জাতিকে পেল, যারা তাঁর কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। তারা বললঃ হে যুলকারনাইন! ইয়াজূজ ও মাজূজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। আপনি বললে আমরা আপনার জন্যে কিছু কর ধার্য করব এই শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন। সে বললঃ আমার পালনকর্তা আমাকে যে সামর্থ দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। অতএব, তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেব। তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও। অবশেষে যখন পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে গেল, তখন সে বললঃ তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাক। অবশেষে যখন তা আগুনে পরিণত হল, তখন সে বললঃ তোমরা গলিত তামা নিয়ে এসো, আমি তা এর উপরে ঢেলে দেই। অতঃপর ইয়াজূজ ও মাজূজ তার উপরে আরোহণ করতে পারল না এবং তা ভেদ করতে-ও সক্ষম হল না।” (সূরা কাহফ ৯২-৯৭)

কে সে যুল কারনাইন?
তিনি হচ্ছেন -এক সৎ ঈমানদার বাদশা। নবী ছিলেন না (প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী)। পৃথিবীর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভ্রমণ করেছেন বলে তাঁকে যুলকারনাইন বলা হয়। অনেকে আলেকজান্ডার কে -যুলকারনাইন আখ্যা দেন, যা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, যুলকারনাইন মুমিন ছিলেন আর আলেকজান্ডার কাফের। তাছাড়া তাদের দু-জনের মধ্যে প্রায় দুই হাজার বৎসরের ব্যবধান। (আল্লাহই ভাল জানেন)
বিশ্ব ভ্রমণকালে তিনি তুর্কী ভূমিতে আর্মেনিয়া এবং আযারবাইজানের সন্নিকটে দু-টি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছেছিলেন। এখানে দু’টি পাহাড় বলতে ইয়াজূজ-মাজূজের উৎপত্তিস্থল উদ্দেশ্য, যেখান দিয়ে এসে তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত, ফসলাদি বিনষ্ট করত। তুর্কীরা যুলকারনাইন সমীপে নির্ধারিত টেক্সের বিনিময়ে একটি প্রাচীর নির্মাণের আবেদন জানাল। কিন্তু বাদশ যুলকারনাইন পার্থিব তুচ্ছ বিনিময়ের পরিবর্তে আল্লাহর প্রতিদানকে প্রাধান্য দিলেন। বললেন- ঠিক আছে! তোমরা আমাকে সহায়তা করো! অতঃপর বাদশা ও সাধারণের যৌথ পরিশ্রমে একটি সুদৃঢ় লৌহ প্রাচীর নির্মিত হল। ইয়াজূজ-মাজূজ আর প্রাচীর ভেঙে আসতে পারেনি।

ইয়াজূজ-মাজূজের ধর্ম কি? তাদের কাছে কি শেষনবীর দাওয়াত পৌঁছেছে?
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, তারা হচ্ছে আদম সন্তানের-ই এক সম্প্রদায়। হাফেয ইবনে হাজার রহ.এর মতে- তারা নূহ আ.-এর পুত্র ইয়াফিছের পরবর্তী বংশধর।
ইমরান বিন হুছাইন রা. থেকে বর্ণিত, কোন এক ভ্রমণে আমরা নবীজী সাথে ছিলাম। সাথীগণ বাহন নিয়ে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়ল। নবীজী উচ্চকণ্ঠে পাঠ করলেন- “হে লোক সকল! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। নিশ্চয় কেয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুধের শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয় বস্তুতঃ আল্লাহর আযাব বড় কঠিন।” (সূরা হাজ্ব ১-২) নবীজীর উচ্চবাক্য শুনে সাহাবাগণ একত্রিত হতে লাগলেন, সবাই জড়ো হলে বলতে লাগলেন- “তোমরা কি জান- আজ কোন দিবস? আজ হচ্ছে সেই দিবস, যে দিবসে আদমকে লক্ষ্য করে আল্লাহ বললেনঃ জাহান্নামের উৎক্ষেপণ বের কর! আদম বলবেঃ জাহান্নামের উৎক্ষেপণ কি হে আল্লাহ..!? আল্লাহ বলবেন- প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জন জাহান্নামে আর একজন শুধু জান্নাতে!! নবীজীর কথা শুনে সাহাবাদের চেহারায় ভীতির ছাপ ফুটে উঠল। তা দেখে নবীজী বলতে লাগলেন- আমল করে যাও! সুসংবাদ গ্রহণ কর! সেদিন তোমাদের সাথে ধ্বংসশীল আদম সন্তান, ইয়াজূজ-মাজূজ এবং ইবলিস সন্তানেরা-ও থাকবে, যারা সবসময় বাড়তে থাকে (অর্থাৎ ওদের থেকে নয়শ নিরানব্বই জন জাহান্নামে, আর তোমাদের থেকে একজন জান্নাতে)। সবাই তখন আনন্দ ও তৃপ্তির নিশ্বাস ছাড়ল। আরো বললেন- আমল করে যাও! সুসংবাদ গ্রহণ কর! ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ নিহিত! মানুষের মাঝে তোমরা সেদিন ঊটের গায়ে ক্ষুদ্রচিহ্ন বা জন্তুর বাহুতে সংখ্যাচিহ্ন সদৃশ হবে।-” (তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ)
অর্থাৎ হাশরের ময়দানে ইয়াজূজ-মাজূজ, পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি এবং ইবলিস বংশধরদের উপস্থিতিতে তোমাদেরকে মুষ্টিমেয় মনে হবে। ঠিক উটের গলায় ক্ষুদ্র চিহ্ন আঁকলে যেমন দেখা যায়, হাশরের ময়দানেও তোমাদের তেমন দেখাবে।

ইয়াজূজ-মাজূজের সংখ্যাধিক্যঃ
আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেন- “ইয়াজূজ-মাজূজ আদম সন্তানের-ই একটি সম্প্রদায়। তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হলে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলবে। তাদের একজন মারা যাওয়ার আগে এক হাজার বা এর চেয়ে বেশি সন্তান জন্ম দিয়ে যায়। তাদের পেছনে তিনটি জাতি আছে- তাউল, তারিছ এবং মাস্ক।-” (তাবারানী)

আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. বলেন- “দশ ভাগে আল্লাহ পাক সৃষ্টিকে বিভক্ত করেছেন। তন্মধ্যে নয়টি ভাগে ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেছেন। বাকী একটি ভাগে অবশিষ্ট সকল সৃষ্টকে সৃষ্টি করেছেন। ফেরেশতাদের আবার দশটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। তন্মধ্যে নয়টি ভাগ দিন-রাত বিরামহীন আল্লাহর আদেশ মতে কাজ করে চলেছে। একটি ভাগ আল্লাহ পাক নবী রাসূলদের কাছে প্রেরণের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। অতঃপর সাধারণ সৃষ্টিকে আবার দশটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। তন্মধ্যে নয়টি ভাগে জিন তৈরি করেছেন, একভাগে আদম সন্তান। অতঃপর আদম সন্তানকে আল্লাহ দশভাগে ভাগ করেছেন। তন্মধ্যে নয়ভাগে সৃষ্টি করেছেন ইয়াজূজ-মাজূজ, আর অবশিষ্ট একভাবে সকল মানুষ।-” (মুস্তাদরাকে হাকিম)

দৈহিক গঠনঃ
খালেদ বিন আব্দুল্লাহ -আপন খালা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন- একদা নবী করীম সা. বিচ্ছু দংশনের ফলে মাথায় বেন্ডিস বাঁধাবস্থায় ছিলেন। বললেন- তোমরা তো মনে কর যে, তোমাদের কোন শত্রু নেই! (অবশ্যই নয়; বরং শত্রু আছে এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে) তোমরা যুদ্ধ করতে থাকবে। অবশেষে ইয়াজূজ-মাজূজের উদ্ভব হবে। প্রশস্ত চেহারা, ক্ষুদ্র চোখ, কৃষ্ণ-চুলে আবছা রক্তিম। প্রত্যেক উচ্চভূমি থেকে তারা দ্রুত ছুটে আসবে। মনে হবে, তাদের চেহারা সুপরিসর বর্ম।” (মুসনাদে আহমদ, তাবারানী)

যেভাবে প্রাচীর ভেঙে যাবেঃ
যুলকারনাইনের নির্মিত সুদৃঢ় প্রাচীরের দরুন দীর্ঘকাল তারা পৃথিবীতে আসতে পারেনি। প্রাচীরের ওপারে অবশ্যই নিজস্ব পদ্ধতিতে তারা জীবন যাপন করছে। তবে অদ্যাবধি তারা সেই প্রাচীর ভাঙতে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, প্রাচীরের বর্ণনা দিতে গিয়ে নবী করীম সা. বলেন- “অতঃপর প্রতিদিন তারা প্রাচীর ছেদনকার্যে লিপ্ত হয়। ছিদ্র করতে করতে যখন পুরোটা উম্মোচনের উপক্রম হয়, তখনি তাদের একজন বলে, আজ তো অনেক করলাম, চল! বাকীটা আগামীকাল করব! পরদিন আল্লাহ পাক সেই প্রাচীরকে পূর্বে থেকেও শক্ত ও মজবুতরূপে পূর্ণ করে দেন। অতঃপর যখন সে-ই সময় আসবে এবং আল্লাহ পাক তাদেরকে বের হওয়ার অনুমতি দেবেন, তখন তাদের একজন বলে উঠবে, আজ চল! আল্লাহ চাহেন তো আগামীকাল পূর্ণ খোদাই করে ফেলব! পরদিন পূর্ণ খোদাই করে তারা প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। মানুষের ঘরবাড়ী বিনষ্ট করবে, সমুদ্রের পানি পান করে নিঃশেষ করে ফেলবে। ভয়ে আতঙ্কে মানুষ দূর দূরান্তে পলায়ন করবে। অতঃপর আকাশের দিকে তারা তীর ছুড়বে, তীর রক্তাক্ত হয়ে ফিরে আসবে।-”
(তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ, মুস্তাদরাকে হাকিম)
হাদিস থেকে যা বুঝলাম
o তারা দিনরাত বিরামহীন খোদাই করে না। যদি করত, তবে পূর্ণ করে ফেলত। সন্ধ্যা পর্যন্ত করে ফিরে যায়।
o সিড়ি বা মই ব্যবহার করে প্রাচীর ডিঙিয়ে আসার বিষয়টি হয়ত তাদের মাথায় আসেনি অথবা চেষ্টা করেও পারেনি।
o প্রতীক্ষিত কাল নাগাদ কখন-ই তারা ইনশাআল্লাহ (আল্লাহ চাহেন তো) বলবে না।
বুঝা গেল, তাদের মাঝেও কর্মঠ ও পরিশ্রমী ব্যক্তি আছে। নেতৃত্ব কর্তৃত্বের অধিকারী-ও আছে। আল্লাহ পাকের ইচ্ছা এবং ক্ষমতা সম্পর্কে জানে- এমন ব্যক্তিও আছে।
এটাও হতে পারে যে, অনিচ্ছা ও অজান্তেই তাদের মুখ থেকে “ইনশাআল্লাহ” বেরিয়ে আসবে।

কোরআনে কারীমে ইয়াজূজ-মাজূজের বিবরণ
আল্লাহ পাক বলেন- “তারা আপনাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুনঃ আমি তোমাদের কাছে তাঁর কিছু অবস্থা বর্ণনা করব। আমি তাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের কার্যোপকরণ দান করেছিলাম…।” “আবার সে পথ চলতে লাগল। অবশেষে যখন দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যস্থলে পৌঁছল, তখন সেখানে এক জাতিকে পেল, যারা তাঁর কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। তারা বললঃ হে যুলকারনাইন! ইয়াজূজ ও মাজূজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। আপনি বললে আমরা আপনার জন্যে কিছু কর ধার্য করব এই শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন। সে বললঃ আমার পালনকর্তা আমাকে যে সামর্থ দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। অতএব, তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেব। তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও। অবশেষে যখন পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে গেল, তখন সে বললঃ তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাক। অবশেষে যখন তা আগুনে পরিণত হল, তখন সে বললঃ তোমরা গলিত তামা নিয়ে এস, আমি তা এর উপরে ঢেলে দেই। অতঃপর ইয়াজূজ ও মাজূজ তার উপরে আরোহণ করতে পারল না এবং তা ভেদ করতে-ও সক্ষম হল না। যুলকারনাইন বললঃ এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ। যখন আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুত সময় আসবে, তখন তিনি একে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আামর পালনকর্তার প্রতিশ্রুতি সত্য। আমি সেদিন তাদেরকে দলে দলে তরঙ্গের আকারে ছেড়ে দেব এবং শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে। অতঃপর আমি তাদের সবাইকে একত্রিত করে আনব।-” (সূরা কাহফ ৯২-৯৭)
হাদিস শরীফে ইয়াজূজ-মাজূজের বিবরণ
o যয়নব বিনতে জাহশ রা. থেকে বর্ণিত, একদা সন্ত্রস্ত চেহারায় নবী করীম সা. তার ঘরে প্রবেশ করে বললেন- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই) ধিক আরবের! তাদের অনিষ্টতা কাছিয়ে গেছে।” হাতের দুই আঙ্গুলে ইশারা করে বললেন, ইয়াজূজ-মাজূজের প্রাচীর থেকে এতটুকু আজ উন্মোচিত হয়ে গেছে। বর্ণনাকারী জিজ্ঞেস করলেন- সৎ নিষ্ঠাবান ব্যক্তিবর্গ থাকতেও আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? বললেন- হ্যাঁ..! পাপাচার বেড়ে গেলে তাই হবে!!” (বুখারী-মুসলিম)
o আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেন- “আল্লাহ পাক আদমকে উদ্দেশ্য করে বলবেন- হে আদম! বলবে- উপস্থিত হে আল্লাহ! সকল কল্যাণ একমাত্র আপনার হাতেই! আল্লাহ বলবেন- জাহান্নামের উৎক্ষেপণ বের কর! আদম বলবে- জাহান্নামের উৎক্ষেপণ কি হে আল্লাহ!? আল্লাহ বলবেন- প্রতি হাজার থেকে নয়শ নিরানব্বই জন। শুনা মাত্রই আতঙ্কে শিশুর চুল সাদা হয়ে যাবে। গর্ভবতীর গর্ভপাত ঘটবে। মানুষকে সেদিন মাতাল মনে হবে; বাস্তবে মাতাল নয়, আল্লাহর আযাব বড় কঠিন। -সেই মুক্তিপ্রাপ্ত একজন কে হবে- প্রশ্নের উত্তরে নবীজী বললেন- সুসংবাদ গ্রহণ কর! তোমাদের থেকে একজন এবং ইয়াজূজ-মাজূজ থেকে এক হাজার। একথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম -আল্লাহু আকবার- ধ্বনি দিল। নবীজী বললেন- তোমরা জান্নাতের একতৃতীয়াংশ হবে আমি আশা করি। সাহাবায়ে কেরাম আবার-ও আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করলেন। নবীজী আর-ও বললেন- বরং তোমরা জান্নাতের অর্ধেক হবে আমি আশা করি। আবার-ও আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারিত হল। নবীজী বললেন- সাদা ষাঁঢ়ের গায়ে একটি কালো পশম যেমন স্পষ্ট নজরে আসে, হাশরের ময়দানে তোমরা-ও তেমনি নজরে আসবে।-” (বুখারী-মুসলিম)
o ইমরান বিন হুছাইন রা. থেকে বর্ণিত, কোন এক ভ্রমণে আমরা নবীজীর সাথে ছিলাম। সাথীগণ বাহন নিয়ে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ল। নবীজী উচ্চকণ্ঠে পাঠ করলেন- “হে লোক সকল! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। নিশ্চয় কেয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুধের শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয় বস্তুতঃ আল্লাহর আযাব বড় কঠিন।” (সূরা হাজ্ব ১-২) নবীজীর উচ্চবাক্য শুনে সাহাবাগণ একত্রিত হতে লাগলেন, সবাই জড়ো হলে বলতে লাগলেন- “তোমরা কি জান- আজ কোন দিবস? আজ হচ্ছে সেই দিবস, যে দিবসে আদমকে লক্ষ্য করে আল্লাহ বললেনঃ জাহান্নামের উৎক্ষেপণ বের কর! আদম বলবেঃ জাহান্নামের উৎক্ষেপণ কি হে আল্লাহ..!? আল্লাহ বলবেন- প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জন জাহান্নামে আর একজন শুধু জান্নাতে!! নবীজীর কথা শুনে সাহাবাদের চেহারায় শঙ্কার ছাপ ফুটে উঠল। তা দেখে নবীজী বলতে লাগলেন- আমল করে যাও! সুসংবাদ গ্রহণ কর! সেদিন তোমাদের সাথে ধ্বংসশীল আদম সন্তান, ইয়াজূজ-মাজূজ এবং ইবলিস সন্তানেরা-ও থাকবে, যারা সবসময় বাড়তে থাকে (অর্থাৎ ওদের থেকে নয়শ নিরানব্বই জন জাহান্নামে, আর তোমাদের থেকে একজন জান্নাতে)। সবাই তখন আনন্দ ও তৃপ্তির নিশ্বাস ছাড়লেন। আরো বললেন- আমল করে যাও! সুসংবাদ গ্রহণ কর! ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ নিহিত! মানুষের মাঝে তোমরা সেদিন ঊটের গায়ে ক্ষুদ্রচিহ্ন বা জন্তুর বাহুতে সংখ্যাচিহ্ন সদৃশ হবে।-” (তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ)
o ঈসা আ.-এর পৃথিবীতে অবতরণ সংক্রান্ত হাদিসে নবী করীম সা. বলেন- “…অতঃপর আল্লাহ পাক ঈসার কাছে ওহী পাঠাবেন যে, আমার একদল বান্দাকে এখন আমি বের করব, যাদের মুকাবেলা করার শক্তি তোমাদের নেই। তুমি মুমিনদের নিয়ে তূর পর্বতে চলে যাও!”
o নাওয়াছ বিন ছামআন রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেন- “অতঃপর আল্লাহ ইয়াজূজ-মাজূজকে বের করবেন। তারা প্রত্যেক উচ্চভূমি থেকে অবতরণ করবে। তাদের প্রথম দল বুহাইরা তাবারিয়া-য় এসে নিমিষেই সমস্ত পানি পান করে ফেলবে। পরবর্তী দল এসে বলতে থাকবে- এখানে কোন কালে হয়ত পানি ছিল।-” (মুসলিম)
বুহাইরা তাবারিয়াঃ একেبحيرة الجليل (জালীল উপসাগর)-ও বলা হয়। ইংরেজীতে টাইবেরিয়ান লেক। অধিকৃত উত্তর ফিলিস্তীনে অবস্থিত এ লেকটি জর্ডান নদীর সাথে যোগসূত্র স্থাপন করে আছে। লেক’টির দৈর্ঘ্য ২৩ কিঃ মিঃ। সর্বপ্রশস্ত ১৩ কিঃ মিঃ। গভীরতা ৪৪ মিটারের বেশি হবে না। লেকটি সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে ২১০ মিটার নিচুতে অবস্থিত।
নবী করীম সা. বলেন- “অতঃপর ইয়াজূজ-মাজূজ জেরুজালেমের -জাবালে খামর-এর দিকে গিয়ে বলবেঃ জমিনের অধিবাসীকে আমরা নিঃশেষ করেছি, এখন আসমানের অধিবাসীদের নিঃশেষ করব। একথা বলে তারা আসমানের দিকে তীর ছুড়তে থাকবে। আল্লাহ তাদের তীরকে রক্তিম করে ফিরিয়ে দেবেন। ঈসা ও তাঁর সাথীদেরকে অবরোধ করে ফেলা হবে। সেখানে তারা প্রচণ্ড ক্ষুধা এবং অভাবে দিন যাপন করবে। খাদ্যের অভাবে ষাঁঢ়ের মুণ্ডু সেদিন একশ দিনারের চেয়ে-ও বেশি মূল্যের হবে। অতঃপর ঈসা ও তাঁর সাথীদের দোয়ার প্রেক্ষিতে আল্লাহ ইয়াজূজ-মাজূজদের স্কন্ধে এক প্রকার পোকা তৈরি করে দেবেন। ফলে নিমিষেই তারা ধ্বংসমুখে পতিত হবে। অতঃপর ঈসা ও তাঁর সাথীগণ তূর পর্বত থেকে নেমে এসে দেখবেন, ভূমিতে এক বিঘত পরিমাণ জায়গাও অবশিষ্ট নেই; সর্বত্র তাদের লাশ পড়ে আছে। দুর্গন্ধে পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। ঈসা ও তাঁর সাথীগণ আবার-ও দোয়া করবেন। আল্লাহ পাক বড় ঊটের গলাসদৃশ বিরল কিছু পাখী পাঠাবেন। পাখীগুলো এসে ইয়াজূজ-মাজূজদের লাশগুলো আল্লাহর আদেশকৃত স্থানে ফেলে আসবে। অতঃপর আল্লাহ জমিনে বরকতময় বৃষ্টি দিয়ে সকল জনপদ ও ঘরবাড়ীগুলো ধুয়ে দেবেন। সারা পৃথিবী আয়নার মত পরিস্কার হয়ে যাবে। অতঃপর বলা হবে- হে জমিন! ফসল উদগত কর! বরকত প্রকাশ কর! সেদিন একটি ডালিম একাধিক ব্যক্তিকে পরিতৃপ্ত করবে। মানুষ ডালিমের খোলসকে ছায়াদানের কাজে ব্যবহার করবে। দুধের বরকত ফিরে আসবে। একটি মাত্র ঊষ্ট্রীর দুধ সেদিন বহু লোক মিলে পান করতে পারবে। গরুর দুধ সেদিন সারা গোত্রের মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে। বকরির দুধ সেদিন আত্মীয় স্বজন সবার জন্য যথেষ্ট হবে। এভাবে মুমিনগণ জীবনযাপন করতে থাকবেন। অবশেষে আল্লাহ মুমিনদের রূহ কব্জা করতে এক প্রকার সুবাতাস পাঠাবেন। বাহুমূলে স্পর্শিত হওয়া মাত্রই মুমিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। পৃথিবীতে কোন মুমিন অবশিষ্ট থাকবে না; থাকবে শুধু দুষ্ট ও দুশ্চরিত্র লোক, যারা গাধার ন্যায় রাস্তাঘাটে কুকর্মে লিপ্ত হবে। তাদের উপর-ই কেয়ামতের কঠিন আযাব নিপতিত হবে।-” (মুসলিম)
অপর হাদিসে- “মুমিনগণ ইয়াজূজ-মাজূজের নিক্ষেপিত তীর-ধনুক দিয়ে সাত বৎসর পর্যন্ত লাকড়ির কাজ চালাবে।
o আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- “মেরাজের রাত্রিতে নবীজী, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা আ. মিলে কেয়ামত প্রসঙ্গে আলোচনা করছিলেন। সবাই মিলে ঈসাকে বলতে বললে ঈসা আ. বললেন- দাজ্জাল হত্যার পর সকলেই নিজ নিজ দেশে গিয়ে দেখবে ইয়াজূজ-মাজূজ বেরিয়ে এসেছে। সবাই দ্রুত পালিয়ে আমার কাছে চলে আসবে। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করব। আল্লাহ ইয়াজূজ-মাজূজকে ধ্বংস করে দেবেন। সর্বত্রই তাদের পঁচা লাশ পড়ে থাকবে। আবার আল্লাহর কাছে দোয়া করব। আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে তাদের লাশগুলিকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবেন।-” (মুসনাদে আহমদ, মুস্তাদরাকে হাকিম)

ইয়াজূজ-মাজূজ সম্পর্কে কিছু দুর্বল বর্ণনা
এ ব্যাপারে অনেক দুর্বল বর্ণনার উল্লেখ পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির স্বচ্ছ বিবরণ তুলে আনতে কতিপয় দুর্বল হাদিস নিম্নে উল্লেখ হলঃ
হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. বলেন- আমি ইয়াজূজ-মাজূজ সম্পর্কে নবীজীকে জিজ্ঞেস করলে নবীজী বললেন- ইয়াজূজ এক জাতি আর মাজূজ আরেক জাতি। এদের প্রত্যেক জাতির ভেতরে-ও আবার চার লক্ষ জাতি বিদ্যমান। এদের একজন মারা যাওয়ার পূর্বে একহাজার সশস্ত্র ঔরস সন্তান রেখে যায়। বললাম- হে আল্লাহর রাসূল! এরা দেখতে কেমন? বললেন- তিন ধরনের মানুষ তাদের মধ্যে আছে। কিছু আছে আরুয বৃক্ষের মত লম্বা। (আরুয শামের প্রসিদ্ধ বৃক্ষ, স্বাভাবিকভাবে বৃক্ষটি একশ বিশ গজ লম্বা হয়) এদের বিরুদ্ধে কোন লৌহ/কৌশল কাজে আসে না। অপর দল, যারা এক কান মাটিয়ে বিছিয়ে এবং অপর কান গায়ে জড়িয়ে বিশ্রাম করে। হাতি, ঘোড়া, গাঁধা, উট, শুকর- যা-ই সামনে পায় খেয়ে ফেলে। এমনকি নিজেদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তাকেও খেয়ে ফেলে। তাদের সম্মুখদল শামে এবং পশ্চাতদল খোরাছানে থাকবে। টাইবেরিয়ান লেক সহ প্রাচ্যের সকল নদী তারা নিমিষেই চুষে ফেলবে।-” (তাবারানী)

ইয়াজূজ-মাজূজের ধ্বংস
ইয়াজূজ-মাজূজের উদ্ভবে সারা বিশ্ব বিশৃঙ্খলায় ভরে উঠবে। সর্বত্রই তারা হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত আসমানের অধিবাসীকে ধ্বংস করতে তারা উপর দিকে তীর নিক্ষেপ করবে। সুতরাং ঈসা নবীর সহচর এবং মুষ্টিমেয় পলায়নকারী ব্যতীত কেউ রক্ষা পাবে না। ঈসা নবী ও তাঁর সহচরবৃন্দ তখন তূর পর্বতে মহা দুর্ভিক্ষে দিনাতিপাত করবেন। তখন ঈসা আ.-এর দোয়ার প্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক ইয়াজূজ-মাজূজদের স্কন্ধে এক প্রকার পোকা তৈরি করে দেবেন। নিমিষেই সব ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর একপ্রকার দুর্লভ পাখী দিয়ে আল্লাহ এদের পঁচা লাশগুলো দূরে কোথাও নিক্ষেপ করবেন। এরপর জমিনকে তার বরকত প্রকাশ করতে বলা হবে।
আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেন- “ইয়াজূজ-মাজূজের উদ্ভব হবে। প্রতিটি উচ্চভূমি থেকে তারা লাফিয়ে অবতরণ করবে। মুমিনগণ মেষপাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাবে। অতঃপর ইয়াজূজ-মাজূজ ভূমির সকল পানি খেয়ে ফেলবে। পরবর্তী দল নদীর পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে বলবে, কোন একসময় হয়ত এখানে পানি ছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের ধারণানুযায়ী কেউ যখন বেঁচে থাকবে না, তখন বলবে- জমিনের অধিবাসীকে আমরা শেষ করেছি এবার আসমানবাসীদের নিঃশেষ করব। একথা বলে তারা আকাশের দিকে বর্ষা নিক্ষেপ করলে আল্লাহ তাদের বর্ষাকে রক্তিম ফিরিয়ে দেবেন। অবশেষে তাদের স্কন্ধে এক প্রকার পোকা তৈরি করে আল্লাহ এদের ধ্বংস করবেন। অবরোদ্ধ মুসলমান বলবে- কেউ কি আছ? গিয়ে দেখ- শত্রুদের কি হয়েছে? অতঃপর এক মুসলমান মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জ্ঞানে দূর্গের বাইরে এসে যাবে। দেখবে, সবাই মরে একটি অপরটির উপ লাশ হয়ে পড়ে আছে। চিৎকার দেবে- ওহে মুসলমান! সুসংবাদ শুন! আল্লাহ -শত্রুবাহিনীকে ধ্বংস করেছেন। অতঃপর সকল মুসলমান গুহা থেকে বেরিয়ে তাদের জন্তুগুলো ছেড়ে দেবে। বহুদিন পর্যন্ত লাশের মাংস খেয়ে জন্তুগুলো মোটাতাজা হয়ে উঠবে।-” (মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজা, মুস্তাদরাকে হাকিম)
অপর বর্ণনায়- “মুমিনগণ তাদের মৃত্যুর খবর শুনে বলতে থাকবে যে, তারা মরেনি; বরং অন্যান্যদের মত আমাদেরকেও হত্যা করতে তারা মৃত্যুর ভান করেছে। সুতরাং কেউ-ই বের হয়ো না! তখন একজন সাহসী মুমিন বলবে- দরজা খোল! আমি নিজে গিয়ে দেখব! সাথীগণ বলবে, না! তোমাকে আমরা মৃত্যুমুখে ঠেলে দেব না। তখন সে দড়ি বেয়ে পর্বত থেকে নিচে নেমে আসবে। দেখবে, সত্যিই সব মরে লাশ হয়ে পড়ে আছে।-”

ইয়াজূজ-মাজুজ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহের চির সমাপ্তি
ইয়াজূজ-মাজূজ ধ্বংস হওয়ার পর বিশ্বে শুধু মুমিন থাকবে। চারিদিকে কল্যাণের ঝর্ণাধারা বর্ষিত হবে। ধন সম্পদের জয়-জয়কার হবে। যুদ্ধ-বিগ্রহের চির সমাপ্তি ঘটবে।
ছালামা বিন নুফাইল রা. বলেন- “আমি নবীজীর কাছে বসা ছিলাম, এক ব্যক্তি এসে বলল- হে আল্লাহর রাসূল! লোকেরা ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছে, তরবারী রেখে দিয়েছে, সবাই মনে করছে, যুদ্ধ শেষ। নবী করীম সা. বললেনঃ সবার ধারণা মিথ্যা..!! এই মাত্র যুদ্ধের বিধান অবতীর্ণ হয়েছে। আমার উম্মতের একদল লোক সর্বদায় সত্যের পক্ষে যুদ্ধ করতে থাকবে। বিরুদ্ধবাদীরা তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। তাদের জন্য রিযিকপ্রাপ্ত একদল লোকের অন্তরকে আল্লাহ বক্র করে দেবেন। সত্যপন্থী যোদ্ধাগণ কেয়ামত অবধি যুদ্ধ করে যাবে। ইয়াজূজ-মাজূজ বের না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হবে না।-” (সুনানে নাসায়ী, মুসনাদে আহমদ)
ইয়াজূজ-মাজূজের পর-ও হজ্ব-উমরা পালিত হবে
আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেন- “ইয়াজূজ-মাজূজ ধ্বংস হওয়ার পর-ও বাইতুল্লাহ শরীফের উদ্দেশ্যে হজ্বে আসা হবে, উমরা পালিত হবে।-” (বুখারী)

যুলকারনাইনের সেই ঐতিহাসিক প্রাচীর কেউ দেখেছেন? দেখা সম্ভব?
একজন সাহাবী সেই প্রাচীর দেখেছিলেন। ইমাম বুখারী রহ. অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। একব্যক্তি নবীজীর কাছে এসে বলল, আমি সেই প্রাচীর দেখেছি। লাল পথের ধারে সাদা কালো রেখাযুক্ত কাপড়ের মত দেখতে। নবী করীম সা. বললেন- হ্যাঁ..! তুমি ঠিক-ই দেখেছ!!”
ইবনে কাছীর রহ. এ ব্যাপারে বলেন- “২২৮ হিজরীতে খলীফা ওয়াছিক প্রাচীরের সন্ধানে একটি তদন্ত টীম প্রেরণ করেন। তারা দেশ-দেশান্তর ঘুরে অবশেষে সেখানে পৌঁছুতে সক্ষম হয়। প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে, লোহা এবং তামায় নির্মিত বিশাল প্রাচীরে একটি দরজা-ও ছিল। দরজায় বিশাল তালা ঝুলন্ত ছিল। স্থানীয় শাসকের পক্ষ থেকে সেখানে প্রহরী-ও নিযুক্ত করা আছে। বিশাল, সুউচ্চ এবং আকাশসম সেই প্রাচীরটি বড় বড় পাহাড়কেও ছাড়িয়ে গেছে। দুই বৎসর তারা ভ্রমণে ছিল। অনেক আশ্চর্য ও বিরল বিষয় প্রত্যক্ষ করেছিল।-”
কিন্তু ইবনে কাছীর রহ. উপরোক্ত ঘটনার কোন বর্ণনাসূত্র টানেননি। সুতরাং বাস্তবেই তারা দেখেছে কিনা, কিংবা দেখে থাকলে সেটা-ই যুলকারনাইনের প্রাচীর কিনা! আল্লাহই ভাল জানেন।
সপ্তাশ্চর্যের অন্যমত চীনের ঐতিহাসিক প্রাচীর -যুলকারনাইনের প্রাচীর নয়
১) ইয়াজূজ-মাজূজের অনিষ্টতা থেকে সাধারণকে বাঁচাতে যুলকারনাইন -প্রাচীরটি নির্মাণ করেছিলেন। আর চীনের প্রাচীরটি বহিরাক্রমণ থেকে চীনকে বাঁচাতে গির্জা প্রধানেরা নির্মাণ করেছিল।
২) কোরআনের আয়াতে প্রাচীর নির্মাণের সরঞ্জাম লোহা এবং তামা বলা হয়েছে। কিন্তু চীনের সুদীর্ঘ প্রাচীরটি পাথর এবং চুনার তৈরি।
৩) ইয়াজূজ-মাজূজের প্রাচীর দু’টি পর্বতের মধ্যবর্তী সড়কে অবস্থিত। প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে সড়কটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু চীনের প্রাচীর পাহাড়ের উপরিভাগে নির্মিত, যা পূর্ব চীন থেকে নিয়ে পশ্চিম চীন পর্যন্ত হাজারো মাইল জুড়ে বিস্তৃত।
৪) ইয়াজূজ-মাজূজের বদ্ধ প্রাচীর নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কেউ ভাঙতে পারবে না। কিন্তু চীনের প্রাচীর স্থানে স্থানে ভেঙ্গে পড়েছে। বহুবার পুন-সংস্কার হয়েছে, এখনো হচ্ছে। মানুষ ভেতরে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট টেকনোলোজী-ও সেই প্রাচীর আবিস্কার করতে পারেনি
পৃথিবীর কোথায় কি আছে না আছে, কোথায় কি হচ্ছে না হচ্ছে সকল কিছুর একচ্ছত্র জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই। বর্তমান টেকনোলোজী ইয়াজূজ-মাজূজের প্রাচীর বা দাজ্জালের ভয়ানক দ্বীপ আবিস্কারে সক্ষম হয়নি; তার মানে এগুলোর অস্তিত্ব নেই, এমনটি নয়। হতে পারে, কোন প্রজ্ঞার দরুন আল্লাহ পাক মানুষের দৃষ্টিকে এগুলো থেকে ফিরিয়ে রেখেছেন বা এগুলোর কাছে পৌঁছুতে কোন অন্তরায় তৈরি করে দিয়েছেন। প্রতিটি বস্তুর-ই একটি নির্ধারিত সময় আছে। আল্লাহ পাক বলেন- “আপনার জাতি তা মিথ্যারোপ করেছে। আপনি বলুন, আমি তোমাদের উপর তত্তাবধায়ক নই! প্রতিটি সংবাদের-ই নির্ধারিত সময় আছে! (সময় এসে গেলে) ঠিকই তোমরা সব জানতে পারবে।-” (সূরা আনআম ৬৬-৬৭)
আধুনিক কালের টেকনোলোজী প্রাচীন-কালে কেন আবিস্কৃত হয়নি; কারণ, সেটার জন্য-ও আল্লাহ পাক সময় নির্ধারণ করে রেখেছিলেন।
ক্বাযী ইয়ায রহ. বলেন- “ইয়াজূজ-মাজূজ সংক্রান্ত হাদিস বাস্তবসম্মত; এগুলোর উপর ঈমান আনয়ন প্রতিটি মুসলিমের একান্ত কর্তব্য। কারণ, ইয়াজূজ-মাজূজের উদ্ভব কেয়ামত ঘনিয়ে আসার অন্যতম নিদর্শন। ক্ষমতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে কেউ তাদের সাথে পেরে উঠবে না। আল্লাহর নবী ঈসা এবং তাঁর সহচরদেরকে তারা তূর পর্বতে অবরোধ করে ফেলবে। অতঃপর ঈসা নবীর দোয়ার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করবেন। দুর্লভ পাখী পাঠিয়ে তাদের লাশগুলোকে অজানা স্থানে নিক্ষেপ করবেন।-” (মিরক্বাতুল মাছাবীহ)

শেষ কথা
তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফরয?
উত্তরঃ কখন-ই নয়! পূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, আল্লাহ পাক ঈসার কাছে ওহী পাঠাবেন যে, আমার কিছু দুষ্ট বান্দাকে আমি বের করব, এদের মুকাবেলা করার সামর্থ তোমাদের নেই। সুতরাং মুমিনদেরকে নিয়ে তুমি তূর পর্বতে চলে যাও!” (মুসলিম)

Please follow and like us: