একজন বুরহান উদ্দিন

আজ উপমহাদেশের একজন শহীদের কথা বলবো। তার নাম বুরহান। বুরহান মানে প্রমাণ, দলিল। পুরো নাম বুরহান উদ্দিন। দ্বীনের প্রমাণ। নিজের জীবন দিয়ে ইসলামের জন্য নিজের প্রমাণ করলেন প্রেসিডেন্ট বুরহানুদ্দিন রব্বানী।

আফগানিস্থানের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ বাদাখশানে মুহাম্মদ ইউসুফের ঘর আলো করে ১৯৪০ সালে জন্ম হয় বুরহানউদ্দিন রব্বানীর। আফগানিস্তানে ভাষাভিত্তিক দুটো বড় জাতি রয়েছে। এক পশতুন, দুই তাজিক। বুরহানউদ্দিন রব্বানী ছিলেন তাজিক ভাষাভাষী মানুষ।

বুরহানউদ্দিন রব্বানী তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশোনা তার প্রদেশেই শেষ করেন। এরপর তিনি পড়াশোনা করেন কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩ সালে ইসলামিক আইন ও ধর্মতত্ত্বে তার গ্রেজুয়েশন শেষ করেন। এরপর তিনি আরো উচ্চতর পড়াশোনা করার জন্য চলে যান মিশরে, কায়রো আল আযহার ইউনিভার্সিটি। সেখানে তিনি পরিচিত হন ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সাথে। কাজ করতে থাকেন তাদের সাথে। সেই সাথে ইসলামিক দর্শনের উপর মাস্টার্স কমপ্লিট করেন।

এটা সেই সময়ের কথা যখন এই উপমহাদেশে কমিউনিস্টদের উত্থান হচ্ছিল। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত সব স্থানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগ মেধাবী ছাত্ররা এদের ফাঁদে পা দেয়। পাকিস্তানে কমিউনিস্টরা নিষিদ্ধ থাকলেও তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আড়ালে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। সবচেয়ে বেশি কমিউনিস্ট ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগে। ভাসানী, তাজউদ্দিন এসব নেতারা ছিল ছদ্মবেশি কমিউনিস্ট।

সেসময় কমিউনিস্টরা ইসলামপন্থীদেরও বেশ ভালোভাবে বিভ্রান্ত করেছে। পাকিস্তানের ইসলামপন্থীরা ইসলামী কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠা করে খেলাফতে রব্বানী নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন। এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তাদেরই সাংস্কৃতিক উইং এর নাম তমুদ্দুনে মজলিস।

যাই হোক সেই সময়ে বুরহানউদ্দিন রব্বানী তার কলম ধরেন কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে। তখন রাশিয়ায় কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় ছিল। আর রাশিয়া ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি। আফগানিস্তানের পাশেই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাদের প্রভাবে আফগানিস্তানের যুব সমাজ কমিউনিস্ট হতে শুরু করেছে দেদারছে। তখন বুরহানউদ্দিন আফগানিস্তানে মানুষ ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃত রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেন। লেখালিখি করেন। কমিউনিস্টদের প্রকৃত রূপও তিনি আফগানিস্তানের মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন। সেই থেকে তিনি কমিউনিস্টদের শত্রুতে পরিণত হন।

তিনি এর জন্য মিশরের আরবী ইসলামী সাহিত্যগুলো ফার্সি ভাষায় রূপান্তর করতে শুরু করেন। তিনি প্রথন ব্যক্তি যিনি ফি যিলালিল কুরআনসহ সাইয়্যেদ কুতুব শহীদের সমস্ত কাজ ফার্সিতে ভাষান্তর করেন। যাতে ইরান, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মুসলিমরা ইসলামের সঠিক রূপ অনুধাবন করতে পারেন।

তিনি পিএইচডি করার জন্য আবারো মিশরে যান। তিনি গবেষণা করেন ফার্সি কবি জামিকে নিয়ে। বুরহানউদ্দিন রব্বানীর পিএইচডি’র শিরোনাম ছিল, “The Philosophy and Teachings of Abd al-Rahman Muhammad Jami.”

ইতিমধ্যে আফগানিস্তানে ইসলামপন্থীদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় হয়ে গেলেন শতাব্দির অন্যতম মুজাদ্দিদ সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী। বুরহানউদ্দিন নিজেও ভক্ত হয়ে পড়েন। তিনি দেখা করেন মাওলানা মওদুদীর সাথে।

১৯৬৮ সালে বুরহানউদ্দিন রব্বানী আবার আফগানিস্তানে ফিরে আসেন। তখন মাওলানা মওদুদী তাঁকে আফগানিস্তানের ছাত্রদের সংঘবদ্ধ করার দায়িত্ব দেন। একই সাথে তিনি কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে জয়েন করেন। আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট বিরোধী লেখালিখি ও বক্তব্যের জন্য খ্যাতিমান হয়ে উঠেন। চার বছরের মাথায় বুরহানউদ্দিন রব্বানী মোটামুটি একটি বড় মুসলিম কমিউনিটিকে একত্রিত করতে সক্ষম হন।

১৯৭২ সালে জামায়াতে ইসলামী আফগানিস্তান গঠন করা হয় তাঁর নেতৃত্বে। আফগানিস্তানের উচ্চারণে সেটা জমিয়তে ইসলামী হয়ে যায়। আফগানিস্তান জামায়াতের প্রথম আমীর বুরহানউদ্দিন রব্বানী, সেক্রেটারি সাইয়্যেদ নুরুল্লাহ ইমাদ। আরো গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন, উস্তাদ যাবিউল্লাহ, আহমদ শাহ মাসউদ, ইসমাইল খান, আতা মুহাম্মদ নূর, মোল্লা নকীব, ড. ফজলুল্লাহ, গুলুবুদ্দিন হেকমতিয়ার প্রমুখ।

১৯৭৩ সালে আফগানিস্তানের রাজা ছিলেন জহির শাহ। সেসময়ে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণমানুষের ক্ষোভ দেখা যায়। এই গণবিক্ষোভ মূলত কমিউনিস্টদের সৃষ্টি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনীর দাউদ খান ১৯৭৩ সালে ক্যু করেন এবং রাজতন্ত্রের অবসান ঘটান।

১৯৭৪ সালে মুসলিমদের সংগঠিত করার অপরাধে বুরহানউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে দাউদ খান। দাউদ খানের আমলে আসলে আফগানিস্তানের কেউ খুশি হতে পারেনি। সে একই সাথে বামপন্থী ও ইসলামপন্থীদের নির্যাতন করে। সে ছিল স্বৈরাচার।

১৯৭৫ সালে জামায়াতের পশতুন নেতা গুলুবুদ্দিন হেকমতিয়ার পশতুন নেতাদের নিয়ে জামায়াত ত্যাগ করে। জাতিগত কোন্দল করে বেরিয়ে পড়েন তিনি। মূলত তার কোন্দল হয় জামায়াতের ছাত্র সংগঠন সয্‌মান-ই জোওয়ানান-ই মুসলমান (Organization of Muslim Youth)- এর সভাপতি আহমদ শাহ মাসউদের সাথে। তাকে হত্যারও চেষ্টা করেন গুলুবুদ্দিন। অবশেষে তিনি হিজবে ইসলাম নামে আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানে আরেকটি ক্যু হয়। সেই ক্যু এর ফলে ক্ষমতায় চলে আসে বামপন্থীরা। বামপন্থী নেতা ড. নাজিবুল্লাহ ক্ষমতায় আসেন। নাজিবুল্লাহ ক্ষমতায় এসেই ইসলামপন্থীদের উপর দমন পীড়ন শুরু করে।

নাজিবুল্লাহ সমাজতন্ত্রের বিস্তার এবং সেভাবে নীতি নির্ধারণ করতে চাইলে দেশের ইসলামি দলগুলোর সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ-সময় সমাজতন্ত্রী সেনাদের হাতে সারাদেশ পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ নিহত হয়। ১৯৭৯ সালে ২৪ টি প্রদেশে সংঘাত শুরু হয়। অর্ধেকের বেশি সৈনিক সেনাবাহিনীর থেকে পালিয়ে যায়। ৬ই জুলাই বুরহানউদ্দিনের নির্দেশে আহমদ শাহ মাসউদ পানশিরে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সম্মুখ যুদ্ধে সফল না হয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। এ-বছরেই ২৪ শে ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগান সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্যে সেনা প্রেরণ করে। সরকারবিরোধীদের তারা নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে।

জামায়াতের নেতৃত্বে মুজাহিদিন গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুজাহিদিন গ্রুপের প্রধান আহমদ শাহ মাসউদ সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেন। ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রুশ বাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করে। তারপরও নাজিবুল্লার সরকার মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। আহমদ শাহ সরকারবিরোধী লড়াই অব্যাহত রাখেন। দেশে চরম দুরাবস্থা বিরাজমান রেখে ১৯৯২ সালে ১৭ই এপ্রিল এ-সরকার ক্ষমতা ত্যাগ করে। ২৮ এপ্রিল অন্তবর্তীকালীন ইসলামিক সরকারের প্রধান হন সিবঘাতুল্লাহ মুজাদ্দেদী।

২৪ শে এপ্রিল পেশোয়ারে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সমাজতন্ত্রবিরোধী দলগুলোর মধ্যে শান্তি ও ক্ষমতাবন্টন চুক্তি সম্পাদিত হয়। দলগুলো হলো জমিয়তে ইসলামী (বুরহান উদ্দীন রব্বানী), হিজব-ই-ইসলামী (গুলবুদ্দীন হিকমতিয়ার), হিজব-ই-ইসলামী (ইউনুস খালিস), ইত্তেহাদ-ই-ইসলামী [ইসলামিক এলায়েন্স (রাসূল সায়েফ)], মিল্লি ইসলামী মাহাজ (আহমদ গিলারু), জাজহা সিহাত-ই-মিল্লি (সিবঘাতুল্লাহ মুজাদ্দেদী) ও হারাকাত-ই-ইসলামী (নবী মোহাম্মদ)।

এ-চুক্তিতে বুরহান উদ্দিন রব্বানী প্রেসিডেন্ট, আহমদ শাহ মাসউদকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও গুল্বুদ্দিন হেকমতিয়ারকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। কিন্তু হেকমতিয়ার এ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। মূলত তাকে রাজি করান উসামা বিন লাদেন। কারণ লাদেন বুঝতে পেরেছিল এখন যদি গুলুবুদ্দিন চুক্তি না মানে তাহলে তার সাথে মাসউদের যুদ্ধ অনিবার্য। অন্যদিকে মাসউদও চাইছিলেন যুদ্ধ করে হিজবে ইসলামকে পরাজিত করতে।

কিন্তু বাধ সাধেন বুরহানউদ্দিন রব্বানী। তার এক কথা। জামায়াতের হাত কখনোই মুসলিমের রক্তে রঞ্জিত হবেনা। মাসউদকে যুদ্ধ থেকে নিভৃত করেন তিনি।

অবশেষে গুলুবুদ্দিন সিআইএ সৃষ্ট আল কায়েদার প্রধান বিন লাদেনের পরামর্শক্রমে চুক্তিতে রাজি হন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর বিন লাদেনের পরামর্শ এবং সাহায্যে কোন কারণ ছাড়াই মাত্র ছয় মাসের মাথায় ইসলামী রিপাবলিক অব আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

বুরহানউদ্দিন রব্বানী চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে হেকমতিয়ারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেন। হেকমতিয়ারের দাবী ছিল তার অধীনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও দিতে হবে এবং আফগান সেনাবাহিনী তার নেতৃত্বে থাকবে। এটা মেনে নেয়া ছিল বুরহানউদ্দিন রব্বানীর জন্য আত্মহত্যার শামিল। তিনি হিজবে ইসলামের সকল যোদ্ধাকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এরপরও শান্তিতে রাজি ছিলেন না হেকমতিয়ার। হেকমতিয়ার কাবুলে গণহত্যা চালান। এজন্য তাকে কাবুলের কসাই বলা হয়।

সরকারি সুবিধা নিয়ে হেকমতিয়ার বিদ্রোহ করে। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। চরম গোলযোগের মধ্যে আমেরিকার মদদপুষ্ট আল কায়েদা ও পাকিস্তান সরকার নতুন গোষ্ঠী তৈরি করে। এদের নাম তালিবান। এদের উত্থান হয় বিদেশী শক্তির মদদে। ১৯৯৬ সালে ২৭শে সেপ্টেম্বর তালেবান ক্ষমতা দখল করে। হেকমতিয়ার এবং আহমদ শাহ মাসউদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। আহমদ শাহ মাসউদ তালিবান বিরোধী জোট গঠন করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। আহমদ শাহ মাসউদ ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সামরিক শাখার প্রধান।

বুরহানউদ্দিন রব্বানী, যিনি আফগানিস্তান থেকে কমিউনিস্ট ও রুশদের তাড়াতে সবচেয়ে বেশি সংগ্রাম করেছিলেন তাকেই তালেবানরা হটিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে। তারপরও হাল ছাড়েননি তিনি। আমেরিকার ষড়যন্ত্র ও তালেবানদের সম্পর্কে সজাগ করেছিলেন আফগানিস্তানের মানুষকে। তালেবান শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী দশ শতাংশ আফগানিস্তানের শাসক ছিল।

২০০১ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর (টুইন টাওয়ারে হামলার মাত্র দুই দিন আগে) উত্তর আফগানিস্তানর তাখার প্রদেশে খাজা বাহাউদ্দিন এলাকায় আল কায়েদা আত্মঘাতি হামলায় আহমদ শাহ মাসউদকে হত্যা করে। ওসামা বিন লাদেন শুরু থেকেই জামায়াতের বিরুদ্ধাচরন করে যাচ্ছিল। এর আগে বহুবার কেজিবি, আইএসআই আফগান কমিউনিস্ট কেএইচএডি, তালেবান ও আল-কায়েদা তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করে । কিন্তু তাদের সেসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তাঁর জন্মস্থান বাজারাকেই তাঁকে দাফন করা হয়।

শহীদ বুরহানউদ্দিন রব্বানী চাইলে সমাজতন্ত্রীদের পতনের পর হেকমতিয়ারকে উড়িয়ে দিতে পারতেন। তাদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান চালাতে পারতেন রাষ্ট্রীয় শক্তি নিয়ে। কিন্তু এই মহান মানুষ কখনোই ভ্রাতৃঘাতি কার্যক্রমের পক্ষে ছিলেন না। তিনি সব মুসলিম ভাইকে নিয়ে আফগানিস্তানকে সাজাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হেকমতিয়ারের একগুঁয়েমির কারণে সব ভেস্তে যায়। তার অসদাচারনের জন্য বিদেশী শক্তি আসে আল কায়েদা ও তালিবানের নাম করে। তিনি তালিবানের বিপক্ষেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চাননি। কিন্তু পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রনে শেষ পর্যন্ত ছিল না।

২০০১ সালে আমেরিকা সরাসরি আক্রমণ করে আফগানিস্তান দখল করে। এই দখলের জন্যই আল কায়েদা ও তালেবানের সৃষ্টি। তার চেয়ে বড় কথা হলো আফগানিস্তানে জামায়াত ক্ষমতায় আসায় তা মাথাব্যাথার কারণ হয় আমেরিকার। সব মিলিয়ে আফগানিস্তানে জামায়াত ও ইসলামপন্থীদের বড় বিজয়ের পরও তা হাতছাড়া হয়ে যায় কিছু হটকারি জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতার জন্য।

শহীদ বুরহানউদ্দিন রব্বানী আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সহ্য করতে পারছিলেন না। এদিকে তালেবান দমন না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকা তাদের সৈন্য প্রত্যাহারে রাজি হচ্ছে না। আমেরিকা সারা দেশ থেকে তালেবানদের হটালেও কান্দাহার ও হেলমান্দ প্রদেশ থেকে তাদের তাড়াতে পারছে না। এটা মূলত ছিল আমেরিকানদের কৌশল। তারা চায় তালেবান টিকে থাকুক। তাহলে তারাও আফগানিস্তানে ঘাঁটি করে থাকতে পারবে।

২০১১ সালে তিনি কাবুল সরকার, তালিবান এবং মার্কিনিদের মধ্যে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি হয়ে উঠেন এই তিন বাহিনীর মধ্যস্থতাকারী। তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে চেয়েছেন। মুসলিম রক্ত নিয়ে মুসলিমরাই রক্ত উৎসব শুরু করেছিল। তিনি এটা বন্ধ করতে চেয়েছেন।

তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিল বারাক ওবামা। তিনি বিষয়টাকে মুখে মুখে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কথা ছিলো যদি যুদ্ধ বন্ধ হয় তাহলে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার করা হবে। বারাক ওবামা নিজেকে ষড়যন্ত্রের বাইরে রাখার জন্য ও শান্তিতে আমেরিকা বিশ্বাসী এটা প্রমাণ করার জন্য কয়েক ব্রিগেড সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

শান্তিচুক্তি অনুসারে আফগানিস্তানে কান্দাহার ও হেলমান্দ শাসন করবে তালেবানরা। আফগান সরকার তাদের সাথে যুদ্ধ করবে না। বিনিময়ে তারা শুধু ট্যাক্স প্রধান করবে। শান্তি চুক্তি হলে আমেরিকার সৈন্য আফগানিস্তান ছাড়বে। এই চুক্তি সব পক্ষের জন্য ভালো হলেও খারাপ হবে শুধু আমেরিকার জন্য।

তারা যে উদ্দেশ্যে আফগানিস্তানে ঘাঁটি তৈরি করেছে তা ব্যহত হবে। শান্তিচুক্তির কয়েকদিন আগে তালেবানের পক্ষ থেকে জানানো হয় তাদের আর কিছু কথা আছে। তারা আফগান হাই পিস কাউন্সিলের প্রধান বুরহানউদ্দিন রব্বানীর সাথে চুক্তি বিষয়ে কথা বলতে চায়। বুরহানউদ্দিন রব্বানী তাদের সাথে কথা বলার তারিখ দেন ২০ সেপ্টেম্বর ২০১১ সাল। তালিবানের পক্ষ থেকে আলোচনার নাম করে দু’জন এসে আত্মঘাতী হামলা করে। এতে শাহদাত বরণ করেন আফগানিস্তানের শান্তি রক্ষায় ও বিদেশী শক্তি থেকে দেশ উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বুরহানউদ্দিন রব্বানী।

বুরহানউদ্দিন রব্বানীকে খুন করে তালেবানরা আমেরিকার স্বার্থ উদ্ধার করলো। এই ঘটনার পর ষড়যন্ত্রকারী বারাক ওবামা কপট দুঃখ প্রকাশ করে আরো প্রচুর সেনাসদস্যদের আফগানিস্তানে পাঠায়। ভেস্তে যায় শান্তি চুক্তি। আফগানিস্তানে মার্কিনিদের অবস্থান আরো পোক্ত হয়।

লেখক – আহমেদ আফগানী

মূল লেখা এখানে

Please follow and like us: