স্পার্টাকাস

স্পার্টাকাস। আজ থেকে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় আগের একজন মানুষ। রাসুল সা. এর জন্মের প্রায় সাড়ে ছয়শ/সাতশ বছর আগে, অথবা ঈসা আ. এর প্রায় এক শতাব্দী আগের। ‘প্রাচীন’ রোমের একজন গ্ল্যাডিয়েটর। রোম তখন ছিলো বর্তমানের আমেরিকা বা ইউরোপ।

এখন আমরা যেভাবে যার যার পছন্দের খেলা নিয়ে গভীর চিন্তা ও আলোচনায় ব্যস্ত থাকি, তখনকার দিনে মানুষ গ্ল্যাডিয়েটরদের মল্লযুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। সবাই বলাবলি করতো কোন গ্ল্যাডিয়েটরের পারফর্মেন্স কেমন, কে কোন জার্সি পড়তেছে অর্থ্যাৎ কোন আর্মার আছে তার কাছে, কোন কোম্পানী বা কোন হাউজ/সিনেটর/ম্যাজিস্ট্রেট কোন গ্ল্যাডিয়েটরকে স্পন্সর করতেছে, বা মালিক। বলাবাহুল্য, তখনকার দিনের নিয়ম অনুযায়ী গ্ল্যাডিয়েটররা ছিলো ক্রীতদাসদের অন্তর্ভূক্ত।

মানুষজন হাজারে হাজারে, বরং লাখে লাখে দল বেধে টিভি স্ক্রিণের সামনে অর্থ্যাৎ এরিনাতে সেঁটে থাকতো। একেকটা গোল অথবা ছক্কা অথবা তলোয়ারের পোঁচ দেখে সমস্বরে তুমুল জয়ধ্বনিতে ফেটে পড়তো। চিতকার দিতে দিতে তাদের চোখ মুখ ফেটে বের হয়ে আসতো আনন্দে। পছন্দের গ্ল্যাডিয়েটরের পরাজয়ে তারা বিষণ্ণ হয়ে পড়তো। অথবা বিজয়ে তারা তুমুল আনন্দিত হয়ে থাকতো।

পরের কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ এমনকি কয়েক মাস জুড়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সমাজে রাস্তাঘাটে পানশালায় গোসলখানায় কথাবার্তা চলতো। পত্রিকা, টিভি চ্যানেল, ট্রিবিউন, দেয়াল পত্রিকাগুলো ভরে থাকতো খবরে। একেকটা গ্ল্যাডিয়েটর কনটেষ্ট অথবা চ্যারিয়ট রেইস অথবা স্টেইজড এনিমেল হান্টের দর্শক সংখ্যা কখনো কখনো দুই-আড়াই লক্ষ মানুষও ছাড়িয়ে যেতো।

আজকের মেসি, রোনালদো, সালাহ, শহীদ আফ্রিদি, তেন্ডুলকার কিংবা মুশফিকরা ছিলো তখনকার দিনের স্পার্টাকাস, গ্যানিকাস, ক্রিক্সাস, এগরন, স্পিকুলাস, হারমাস, মার্কাস এটিলাস এরা। এদের ক্যারিয়ার বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠতো। কেউ ফর্মে থাকতো। কেউ রিটায়ার করতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবশ্য রিটায়ার করার অর্থ ছিলো এরিনাতে তুমুল যুদ্ধের পর কল্লা কাটা যাওয়া। তাতেও ফ্যানরা খুশি হতো। বিষণ্ণ হতো। তারা পেলে, মেরাডোনা, মোহাম্মদ আলী ক্লে’র মতো হয়ে সমাজের স্মৃতিতে থেকে যেতো। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মানুষ তাদের কথা বলতো। উৎসাহ নিতো। তাদের মুর্তি বানানো হতো।

স্পার্টাকাস প্রথমে ছিলো রোমান সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক। সে চাকরি ছেড়ে সাধারণ জীবনযাপন করার জন্য পালিয়ে গেলে তাকে ধরে এনে ক্রীতদাস বানানো হয়। তারপরের কয়েক বছরে সে হয়ে উঠে অন্যতম সেরা গ্ল্যাডিয়েটর। তার মালিকের নাম ছিলো বাটিয়াটুস, বর্তমান ইটালীর নেপলস শহরের পঁচিশ কিলোমিটার উত্তরে কাপুয়া শহরের একজন ধনী ব্যবসায়ী।

স্পার্টাকাস গ্ল্যাডিয়েটরের সেলিব্রিটি কিংবা স্পোর্টস স্টার মর্যাদার চেয়ে বরং একজন মুক্ত মানুষ হতে বেশি পছন্দ করেছিলো। সুতরাং সে তার সহকর্মী গ্ল্যাডিয়েটরদেরকে উস্কানি দিয়ে বিদ্রোহ করে। বাটিয়াটুসের বাড়ি ধ্বংস করে তাদেরকে নিয়ে সে আবার পালিয়ে যায়। কিন্তু রোম সভ্যতায় ক্রীতদাসের বেয়াদবি ছিলো অনেক বড় অপরাধ। পুরো সমাজের ভিত্তি নড়ে যাবে এটা হতে দিলে। সুতরাং পরের বছরগুলোতে তাদেরকে শুধু যুদ্ধ করে যেতে হয়। স্পার্টাকাসের আন্দোলন পরিণত হয় রোমের দাস বিদ্রোহে। অসম যুদ্ধে বারবার অবিশ্বাস্য বিজয়ের পর একসময় গিয়ে সে অনিবার্যভাবেই মারা যায়। তবু সে কখনো আত্মসমর্পণ করেনাই অথবা রোমের সীমানার বাইরে পালিয়ে যায় নাই। এ কারণে স্পার্টাকাস বিখ্যাত। রোমের সুবিধাভোগী শ্রেণীর জালিমদের নাম মানুষ মনে রাখেনাই কিন্তু স্পার্টাকাস হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার নাম।

যাইহোক, বিদ্রোহের প্রথম দিকে যখন শহরের নাগরিকরা আতংকিত, রোমের বড় বড় ব্যবসায়ীরা শংকিত, লোকাল আর্মি বারবার পরাজিত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে, তখন রাজধানী থেকে একজন প্রিটর বা জেনারেলকে কাপুয়া পাঠানো হয়। তার নাম গায়াস ক্লডিয়াস গ্লেবার। রোমান সেনাবাহিনীর প্রিটর গ্লেবারের শ্বশুড় ছিলো রোমের একজন সিনেটর। মন্ত্রী বলা যায় আর কি। সেও কাপুয়া আসে।

স্পার্টাকাসের ঘটনা নিয়ে একটা ধারাবাহিক নাটক আছে। ঐ নাটকের এক পর্যায়ে কিছু কথাবার্তা আমার মাথায় ঢুকে গেছিলো। অনেকগুলো ছোটখাটো অভিযান এবং যুদ্ধে যখন স্পার্টাকাস বিজয়ী হচ্ছিলো, বিভিন্ন জায়গা থেকে দাসদেরকে মুক্ত করছিলো তখন এক পর্যায়ে জেনারেল গ্ল্যাবার, সিনেটর এলবিনিয়াস, কাপুয়ার প্রশাসক ম্যাজিষ্ট্রেট গ্যালিনিয়াস, এবং আরেকজন প্রিটর বা সেনাপতি ভারিনিয়াস, পুলিশ কমিশনার সেপিয়াস এরা অভিযানের পরিকল্পনা করতে বসে।

তারা ঠিক করে, বড় অভিযানে বের হওয়ার আগে নাগরিকদের মনোবল শক্ত করা দরকার। সুতরাং আগে উৎসব করতে হবে। মানে ওয়ার্ল্ড কাপ হবে আর কি। গান্ডু কমনাররা দলে দলে এরিনাতে গিয়ে ম্যাচ দেখবে। গোল আর ছক্কা দেখতে ব্যস্ত জনসাধারণ স্পার্টাকাস বাহিনীর অথবা বিদ্রোহী ক্রীতদাসদের সম্ভাব্য হুমকিকে আর হুমকি হিসেবে মনে রাখবে না। তারা রোমান সম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠত্ব এবং গৌরব সম্পর্কে অবচেতনভাবেই সচেতন হয়ে উঠবে। অন্যদিকে সমাজের বাস্তব সমস্যাগুলো ভুলে যাবে পুরোপুরি।

ঠিক এ কথাগুলোই নাটকের ঐ পরামর্শ সভায় রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, সেনাপতি; এসব সমাজপতিরা বলেছিলো। প্রিটর গ্ল্যাবার চাচ্ছিলো সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে যেতে সবার আগে, পরে উৎসব। তখন পোড় খাওয়া ঝানু সিনেটর এলবিনিয়াস বলেছিলো, সমাজকে সবার আগে লাইনে রাখতে হবে। মানুষকে ব্যস্ত রাখতে হবে। নাগরিকদেরকে সাইকলজিকালি খাবার দিতে হবে। রোম সম্রাজ্যের বিশাল সাগরের সামনে স্পার্টাকাস একটা ধুলিকণা। তাকে লাইনে আনা হবে কিন্তু এ সম্রাজ্যের ভিত্তি ঠিক রাখতে হলে প্রায়োরিটি হলো পাবলিককে নিয়মিত খেলে যেতে হবে।

স্পয়লারঃ গ্ল্যাবারের আর্মি বড় অভিযানে যাওয়ার আগে স্পার্টাকাস প্রিএমটিভ এটাক করে বসে। তার যুদ্ধকৌশল ছিলো আনকনভেনশনাল। গেরিলা আক্রমণে সে কাপুয়ার এরিনা ধ্বংস করে দেয়। আরো অনেক যুদ্ধের পর এবং আরো পরে গিয়ে আরেকজন সেনাপতি ক্রেসাসের বাহিনীর হাতে সে পরাজিত হয়। ক্রেসাসের বাহিনীতে একজন অফিসার ছিলো গায়াস জুলিয়াস সিজার, পরে যে বিখ্যাত বীর হয়ে উঠে।

ঘটনা হলো, হাজার হাজার বছর আগের কথা বলতে গিয়ে অনেকে বলে, কি একটা আদিম সমাজ ছিলো। আদিম নিয়মকানুন। আদিম কাজকারবার। সত্যি কথা হলো, অতীতের ঘটনা যত দেখি বর্তমানের একজন হিসেবে আমি ততই বেশি অনুভব করি ‘আদিম’ বলে আসলে কিছু নাই। আমরাও আদিম। ভবিষ্যতের সাই-ফাই যুগে যারা জীবনযাপন করবে, তারাও আদিম। মানুষ সবসময় একই প্রকৃতির, একই ধরণের। আদিমতা বনাম আধুনিকতার ধারণা পুরাটাই একটা ফাকাফাকি।

কিছু যন্ত্রপাতি আর অক্ষরজ্ঞানের স্ক্রিণসেভার দিয়ে নিজেদের জন্য প্রগ্রেসিভ/উন্নত/সভ্য/আধুনিক ইত্যাদি বিশেষণ যোগ করার যে ছলনা এবং মিথ্যা বাহাদুরি করি আমরা, অথচ বাস্তবে আমাদের আচরণ ও জীবনযাত্রা কি, তা দেখে আসলে পুরানো ঢাকার ‘ঘোড়ায় ভি দাঁত বাইর কৈরা হাছবো’।

 

লেখক – আমান আব্দুহু

মুল লেখা এখানে

Please follow and like us: